সুরা -ইখলাস ১নাম্বার আয়াতের তাফসির

সুরা-ইখলাস
★بسم الله الرحمن الرحيم★
★বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম ★
পরম করুনাময় মহান আল্লাহ তায়ালার নামে--------
১) قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ
কু’ল হুয়া ল্লা-হু আহাদ,
★---------------------★

তাফসির:-
প্রথমে কু’ল শব্দটি নিয়ে বলি। 
কু’ল (গলার ভীতর থেকে কু বলা) অর্থ
“বল।” 
সাবধান থাকবেন, শুধু ‘কুল’ অর্থ কিন্তু ‘খাও।’ নামাযে সূরা ইখলাস পড়ার সময় ভুলে বলবেন না, “খাও, তিনি আল্লাহ্‌, অদ্বিতীয়!”

এখন কেন আল্লাহ্‌ এখানে বললেন, “বল”? কেন তিনি শুধু বললেন না, “তিনি আল্লাহ্‌, অদ্বিতীয়?” আপনাকে যদি জিগ্যেস করা হয়, “আপনি কে?”, আপনি কি তার উত্তরে বলবেন, “বল, আমি কুদ্দুস, মানুষ।” নিশ্চয়ই না। তাহলে প্রশ্ন আসে, কেন “বল” দিয়ে শুরু হল?
একদিন কয়েকজন খ্রিস্টান এসে নবী মুহম্মাদ (সা) এর সাথে ইসলাম নিয়ে কথা বলছিল, ইসলাম সম্পর্কে জানার চেষ্টা করছিল। নবী (সা) তার স্বভাবগত হাসি মুখে সুন্দরভাবে তাদের প্রশ্নগুলোর উত্তর দিচ্ছিলেন। এক পর্যায়ে তারা জিগ্যেস করলো, “তোমাদের সৃষ্টিকর্তা কে? সে কি দিয়ে তৈরি?” এই পর্যায়ে হঠাৎ করে নবীর (সা) চেহারা পরিবর্তন হয়ে গেল। স্বয়ং আল্লাহ্‌ তার শরীরের উপর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তার মুখ দিয়ে বলালেন – “বল, তিনিই আল্লাহ্‌, অদ্বিতীয়! অমুখাপেক্ষী, সবকিছু তাঁর উপর নির্ভরশীল। তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং কেউ তাকে জন্ম দেয়নি। তাঁর সমকক্ষ আর কিছুই নেই!” তারপর নবী (সা) আবার আগের মতো হাস্যজ্বল, স্বাভাবিক হয়ে গেলেন। এই অভাবনীয় ঘটনায় লোকগুলো হতবাক হয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর তারা বুঝতে পারলো এই মুহূর্তে আসলে কি ঘটে গেল। তারা বুঝতে পারলো এইমাত্র তাদেরকে তাদের প্রশ্নের উত্তর দিলেন স্বয়ং আল্লাহ!
[সুত্রঃ আহমেদ দিদাতের লেকচার]

এবার আসি দ্বিতীয় শব্দ “হুয়া” – “তিনি।” কেন শুধুই, “বল, আল্লাহ্‌ অদ্বিতীয়”, হলো না, কেন এখানে “তিনি” যোগ করা হল? “তিনি” যোগ করার উদ্দেশ্য হল যখন নবী(সা)কে খ্রিস্টান, ইহুদী, মুশরিকরা সৃষ্টিকর্তার ব্যাপারে জিগ্যেস করেছিল, আল্লাহ্‌ তাদেরকে উত্তরে বলেছেন যে তিনি কোনো নতুন সৃষ্টিকর্তা নন। ইসলাম কোনো নতুন ধর্ম নয় যে এখানে কোনো এক নতুন সৃষ্টিকর্তার ধারণা দেওয়া হয়েছে। বাকি সব ধর্মগুলোর বেশিরভাগই দেখবেন নতুন নতুন সৃষ্টিকর্তাকে নিয়ে আসে। কিছু ধর্ম  বিকট আকৃতির হাজার খানেক হাত-পা সহ এক মানুষরূপী প্রাণীকে সৃষ্টিকর্তা বলে দাবি করে। কিছু ধর্ম কোনো এক দাঁড়ি ওলা ভদ্রলোককে সৃষ্টিকর্তা বলে দাবি করে। আবার কিছু ধর্ম দাবি করে সৃষ্টিকর্তা হচ্ছেন একজন কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ। কিন্তু সমগ্র সৃষ্টি জগতের একমাত্র সৃষ্টিকর্তা যে এক, তিনিই যে আল্লাহ্‌, সেটাই এখানে “তিনি” ব্যবহার করে নিশ্চিত করা হয়েছে। ইসলাম কোনো নতুন সৃষ্টিকর্তাকে নিয়ে আসেনি। ইহুদী, খ্রিস্টান, আরব মুশরিকরা যেই সর্বোচ্চ “প্রভু”কে ইতিমধ্যেই “এল্লাহি”, “এলোহিম”, “আল্লাহ্‌” ইত্যাদি বলে জানতো, ইসলাম যে তাকেই সৃষ্টিকর্তা হিসেবে দাবি করে, সেটাই এখানে “তিনি” এর মাধ্যমে আল্লাহ্‌ তাদেরকে জানিয়ে দিয়েছেন।
আপনি যদি আফ্রিকার আদি বাসি জুলু সম্প্রদায়ের কাউকে জিগ্যেস করেন তাদের সৃষ্টিকর্তা ‘ম্‌ভেলিঙ্কাঙ্গি’ কে , সে বলবেঃ “হাউ উম্নিমযানি! উয়েনা, উময়া, অইংগসঅয়েলে। আকাযালি ইয়েনা, ফুতহি আকাযালঅয়াগ্না; ফুতহি, আকুখো লুতমো অলু ফানা নায়ে!”
এর বাংলা অনুবাদ হচ্ছেঃ “তিনি পবিত্র এবং পরমাত্মা। তিনি কাউকে জন্ম দেন না, কেউ তাকে জন্ম দেয়নি এবং তার মতো আর কিছুই নেই।”
সুরা ইখলাসের সাথে খুব একটা পার্থক্য দেখতে পাচ্ছেন? এরপর এই আয়াতে “আল্লাহ্‌” শব্দটি দিয়ে আল্লাহ্‌ সবাইকে ঘোষণা দিলেন যে তাঁর নাম হচ্ছে “আল্লাহ্‌।” আল্লাহ্‌ শব্দটির উৎপত্তি নিয়ে কয়েকটি ব্যাখ্যা রয়েছে। অনেকে মনে করেন এটি আসলে কোনো নাম নয়। বরং আল-ইলাহ থেকে আল্লাহ্‌ এসেছে। কিন্তু তার বিপক্ষে যুক্তি হচ্ছে তাহলে “ইয়া আল্লাহ্‌” বললে সেটা আরবি ব্যাকরণ অনুসারে ভুল হবে, কারণ আমরা কখনও “ইয়া আর রাহমান”, “ইয়া আল ওয়ালাদ” বলতে পারি না। সেটা ব্যাকরণ গত দিক থেকে ভুল। বলতে হবে “ইয়া রাহমান”, “ইয়া ওয়ালাদ।” সুতরাং “ইয়া আল্লাহ্‌” কখনও শুদ্ধ হবে না যদি সেটা আল-ইলাহ থেকে আসতো। সুতরাং আল্লাহ্‌ শব্দটি আল-ইলাহ থেকে আসেনি, এটি একটি বিশেষ নাম। এছাড়াও আরেকটি প্রমাণ হল, সাধারণত আরবি ব্যাকরণ অনুসারে আলিফ এর পড়ে লাম আসলে সেটার হালকা উচ্চারন হয়। সুতরাং প্রচলিত আরবি অনুসারে আল্লাহ্‌ শব্দটির উচ্চারণ হবে হালকা।
কিন্তু আল্লাহ্‌ শব্দটিতে “লা” উচ্চারণ করা হয় ভারী স্বরে – “আলল–হ”, যা প্রচলিত আরবিতে কখনও করা হয় না। আল্লা-হ শব্দটি উচ্চারণ করার সময় আমরা প্রচলিত আরবির সব নিয়ম ভাঙছি। সুতরাং এটি আরেকটি প্রমাণ যে “আল্লাহ্‌” শব্দটি কোনো প্রচলিত আরবি শব্দ নয়, এটি একটি বিশেষ শব্দ, একটি নাম, যা অন্য কোনো শব্দ থেকে আসেনি। এমন কি আরব দেশের খ্রিস্টান এবং ইহুদীরাও, যাদের ভাষা আরবি, তারাও তাদের সর্বোচ্চ সৃষ্টিকর্তাকে “আল্লাহ্‌” বলেই ডাকে।
এই আয়াতের শেষ শব্দটি হচ্ছে ‘আহাদ’ যা এক অসাধারণ শব্দ। প্রচলিত বাংলা অনুবাদ হল – “এক” বা “একক।” কিন্তু সেটা পুরোপুরি সঠিক নয়। কারণ “এক” বলতে আমরা অনেক সময় বুঝি “অনেক কিছুর সমষ্টি।” যেমন এক দেশ, এক জাতি। কিন্তু আল্লাহ্‌ সৃষ্টি জগত এবং সৃষ্টি জগতের বাইরে যা কিছু আছে সবকিছুর সমষ্টি নন। আবার সংখ্যাগত দিক থেকে একের সাথে অন্য সংখ্যা যোগ করা যায়, যেমন ১+১=২, এক-কে ছোট ছোট ভাগে ভাগ করা যায়, যেমন ১ = ০.৫ + ০.৫; সুতরাং সৃষ্টিকর্তার জন্য “এক” শব্দটি ব্যবহার করা সঠিক হবে না, কারণ তিনি মানুষের ধারণা অনুসারে মোটেও এক নন। মানুষ যতই কল্পনা করুক না কেন, তারা কখনই এক বলতে এমন কিছু কল্পনা করতে পারবে না, যা পরম অসীম “এক”, যাকে কোনো ছোট ভাগে ভাগ করা যায় না, যার কোনো তুলনা হয় না, যা ‘অদ্বিতীয়।’
এছাড়াও ভাষাগত দিক থেকে “এক” সংখ্যাটির আরবি হচ্ছে “ওয়াহিদ”, আহাদ নয়। কিন্তু আল্লাহ্‌ ওয়াহিদ নন, তিনি আহাদ। তাকে কোনো সংখ্যা দিয়ে প্রকাশ করা যাবে না। এছাড়াও আরেকটি অদ্ভুত ব্যাপার হল, কু’রআনের আগে কোনদিন কোনো আরব ‘আহাদ’ শব্দটিকে বিশেষণ হিসেবে ব্যবহার করেনি। এটি মুলত ব্যবহার হতো না-বাচক বাক্য তৈরি করতে। কু’রআন হচ্ছে প্রথম কোনো আরব সাহিত্য, যেখানে আহাদ শব্দটিকে  একটি বিশেষণ হিসেবে প্রথম বারের মতো হা-বাচক বাক্যে ব্যবহার করা হয়েছে। একারণেই আল্লাহ্‌ অতুলনীয়, অদ্বিতীয়। তিনি শুধু নিজেই অতুলনীয় নন, তিনি সূরা ইখলাসে যেভাবে তাঁর পরিচয় দিয়েছেন, সেটাও আরবি ব্যকরণ অনুসারে অতুলনীয়।
সবশেষে দেখুন আয়াতটির আরবি শেষ হয়েছে একটি নুন দিয়ে, “আহাদুন।” এটি করা হয় যখন বাক্যে কোনো জোর দেওয়া হয়। বাংলায় আমরা যেরকম বিস্ময় চিহ্ন ব্যবহার করি, সেরকম আরবিতে নুন দিয়ে বাক্য শেষ হয়। একারণে আয়াতটি শেষ হবে “!” দিয়ে -“বল, তিনিই আল্লাহ্‌, অদ্বিতীয়!” আমরা বাংলায় যদি ঠিকভাবে বলতে যেতাম, তাহলে আমাদেরকে গলা উঁচু করে, টেবিলে চাপড় মেরে বলতে হতো “আহাদ!!!”

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন

যোগাযোগ ফর্ম