স্ত্রীদের সাথে সদ্ব্যবহার করুন
عَنْ أَبِىْ هُرَيْرَةَ قَالَ : قَالَ رَسُوْلُ اللّٰهِ ﷺ : «اِسْتَوْصُوْا بِالنِّسَاءِ خَيْرًا فَإِنَّهُنَّ خُلِقْنَ مِنْ ضِلَعٍ وَإِنَّ أَعْوَجَ شَيْءٍ فِى الضِّلَعِ أَعْلَاهُ فَإِنْ ذَهَبْتَ تُقِيمُه كَسْرَتَه وَإِنْ تَرَكْتَه لَمْ يَزَلْ أَعْوَجَ فَاسْتَوْصُوْا بِالنِّسَاءِ». مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ
[১] আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা নারীদেরকে সদুপদেশ দিবে। কারণ তাদেরকে পাঁজরের বাঁকা হাড় হতে সৃষ্টি করা হয়েছে, পাঁজরের হাড়ের মধ্যে সবচেয়ে বাঁকা (হাড়) হলো উপরেরটি। অতঃপর তুমি যদি ঐ হাড়কে সোজা করতে চেষ্টা কর, তবে তা ভেঙ্গে ফেলবে। আর যদি রেখে দাও, তবে সর্বদা বাঁকাই থাকবে। সুতরাং (আমার নাসীহাত) তোমরা নারীদেরকে সদুপদেশ দিবে। [সহীহ : বুখারী ৫১৮৬, মুসলিম ১৪৬৮, ইরওয়া ১৯৯৭, সহীহ আত্ তারগীব ১৯২৭। ]
হাদিসের ব্যাখ্যা : ‘আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) বলেনঃ হাদীসে উল্লেখিত اِسْتَوْصُوْا শব্দের س (সীন) বর্ণ তলব বা অনুসন্ধানের অর্থ প্রদান করেছে। এখানে অর্থ হয়েছে তুমি স্ত্রীদের হাকের ব্যাপারে তোমার নিজের পক্ষ থেকে কল্যাণ অনুসন্ধান কর, অর্থাৎ কল্যাণের দিকটি বিবেচনা কর।
কাযী ‘ইয়ায (রহঃ) বলেনঃ اِسْتَوْصُوْا এর অর্থ হলো «أُوصِيكُمْ بِهِنَّ خَيْرًا فَاقْبَلُوا وَصِيَّتِي فِيهِنَّ...» ‘‘আমি তোমাদেরকে স্ত্রীদের ব্যাপারে কল্যাণের ওয়াসিয়্যাত করছি, সুতরাং তাদের ব্যাপারে আমার ওয়াসিয়্যাত কবুল কর।’’ উদ্দেশ্য হলো তাদের সাথে কোমল এবং সৌজন্যমূলক আচরণ কর; সৃষ্টিগতভাবে তাদের বক্রতার কারণে পূর্ণ দৃঢ় অবস্থান এবং তার ওপর স্থায়ী থাকা তাদের থেকে আশা করা যাবে না। প্রবাদ বাক্যে আছে, স্ত্রীর (বেহায়াপনা ও বক্রতা) থেকে ধৈর্য ধারণের চেয়ে স্ত্রী গ্রহণ না করে অবিবাহিত থেকে ধৈর্যধারণ অধিক সহজ। যেমন আল্লাহ তা‘আলার বাণীঃ ‘‘(বেহায়া, নির্লজ্জ, বক্র) নারীদেরকে বিয়ে না করে বিরত থেকে ধৈর্যধারণ করাই তোমাদের জন্য কল্যাণকর’’- (সূরা আন্ নিসা ৪ : ২৫)।
ضِلَعٍ শব্দটির ض বর্ণে কাসরা বা যের যোগে পঠিত হয়। অর্থাৎ পাঁজরের সবচেয়ে উপরের হাড়, যা সাধারণত বক্র হয়ে থাকে। নারীদরেকে এই বক্র হাড় থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। ঐতিহাসিক সৃষ্টি তত্ত্ব হলো এই যে, আদি মাতা হাওয়া (আঃ)-কে আদম (আঃ)-এর পাঁজরের বক্র হাড় থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। অতএব নারী সৃষ্টির মৌলতত্ত্ব হলো সে বক্র হাড়ের সৃষ্টি। তাই তাদের স্বভাব প্রকৃতিতে রয়েছে বক্রতা, এ বক্রতা কেউই সম্পূর্ণরূপে সোজা করতে পারবে না। বিধায় তাদের সাথে কোমল নরম ও সৌজন্যমূলক আচরণ করে তাদের থেকে কার্যসিদ্ধি করতে হবে। আর তাদের সাথে জীবন যাপনে গুনাহের সম্ভাবনা না থাকলে সৃষ্টিসুলভ বক্র আচরণে ধৈর্যধারণ করবে। এই বক্রতা জোর জবরদস্তি করে সোজা করতে চাইলে তা ভেঙ্গে যাবে। সুতরাং বেশী জোর জবরদস্তি করা যাবে না।
ইমাম নববী (রহঃ) বলেছেনঃ এ হাদীসে নারীদের প্রতি সহানুভূতি এবং ইহসানের জন্য উৎসাহিত করা হয়েছে, আর সৃষ্টিগত বক্র স্বভাবের ও অপূর্ণ জ্ঞানের কারণে ধৈর্যধারণের উপদেশ প্রদান করা হয়েছে। আনুগত্যে দৃঢ় না থাকায় অথবা কারণ ছাড়াই তাদের তালাক দেয়াও অপছন্দনীয় কাজ, অতএব তা থেকে বিরত থাকবে। (ফাতহুল বারী ৬ষ্ঠ খন্ড, হাঃ ৩৩৩১; শারহে মুসলিম ৯/১০ খন্ড, হাঃ ১৪৬৮; মিরকাতুল মাফাতীহ)
وَعَنْهُ قَالَ : قَالَ رَسُوْلُ اللّٰهِ ﷺ : «إِنَّ الْمَرْأَةَ خُلِقَتْ مِنْ ضِلَعٍ لَنْ تَسْتَقِيمَ لَكَ عَلٰى طَرِيقَةٍ فَإِنِ اسْتَمْتَعْتَ بِهَا اسْتَمْتَعْتَ بِهَا وَبِهَا عِوَجٌ وَإِنْ ذَهَبْتَ تُقِيْمُهَا كَسَرْتَهَا وَكَسْرُهَا طَلَاقُهَا». رَوَاهُ مُسْلِمٌ
[২] উক্ত রাবী [আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)] হতে বণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ নারীকে পাঁজরের হাড় হতে সৃষ্টি করা হয়েছে, কক্ষনো সে তোমার জন্য সোজা হবার নয়। অতঃপর তুমি যদি তার নিকট হতে উপকার নিতে চাও, তবে ঐ বক্রাবস্থায় আদায় করতে হবে। তুমি যদি সোজা করতে যাও, তবে ভেঙ্গে ফেলতে পার। ‘ভেঙ্গে ফেলা’ বলতে তাকে (উপায়-উপায়ন্তর না পেয়ে) তালাক প্রদান করা। [সহীহ : মুসলিম ১৪৬৮, সহীহাহ্ ৩৫১৭, সহীহ আল জামি‘ ৩৯৪৩।]
হাদিসের ব্যাখ্যা: এখানে নারী দ্বারা নারী জাতিকে বুঝানো হয়েছে অথবা নারী জাতির আদি সত্বা আদি মাতা হাওয়াকে বুঝানো হয়েছে। তাকে সৃষ্টি করা হয়েছিল আদামের পাঁজরের উপরের বাঁকা হাড় থেকে। তুমি তাকে সর্ববিষয়ে এবং সর্বদাই সোজা রাখতে পারবে না বরং সে একেক সময় একেক অবস্থা ধারণ করবে। কখনো তোমার অবদানের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে, কখনো বা কুফরী করবে, কখনো আনুগত্য করবে, কখনো অবাধ্যচারী হবে, কখনো হবে অল্পে তুষ্ট, কখনো হবে সীমালঙ্ঘনকারী স্বেচ্ছাচারী।
নারীর এ বক্রতার মধ্য দিয়েই তুমি তোমার ফায়দা হাসিল করে নিবে। আর যদি বেশী জোরাজুরি কর তাহলে তাকে সোজা তো করতেই পারবে না, বরং ভেঙ্গে ফেলবে, অর্থাৎ তালাক দিয়ে দিতে হবে। ‘আল্লামা ত্বীবী (রহঃ) বলেনঃ এ হাদীসে বাঁকা হাড় সোজা করা যে অসম্ভব তার ঘোষণা রয়েছে। অর্থাৎ সোজা করতে গিয়ে ভাঙ্গা ছাড়া যদি উপায়ই না থাকে তবে তা ভেঙ্গে ফেলবে বা তালাক প্রদান করবে। কিন্তু তালাক দেয়া তো কাম্য নয়। (শারহে মুসলিম ৯/১০ খন্ড, হাঃ ১৪৬৮; মিরকাতুল মাফাতীহ)
وَعَنْهُ قَالَ : قَالَ رَسُوْلُ اللّٰهِ ﷺ : «لَا يَفْرَكْ مُؤْمِنٌ مُؤْمِنَةً إِنْ كَرِهَ مِنْهَا خُلُقًا رَضِىَ مِنْهَا اٰخَرَ». رَوَاهُ مُسْلِمٌ
[৩] উক্ত রাবী [আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ)] হতে বণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোনো মু’মিন যেন মু’মিনাহ্-কে ঘৃণা না করে (বা তার প্রতি শত্রুতা পোষণ না করে); যদি তার কোনো আচরণে সে অসন্তোষ প্রকাশ করে, তবে অন্য আর এক আচার-ব্যবহারে সন্তুষ্টি লাভ করবে। [সহীহ : মুসলিম ১৪৬৯, আহমাদ ৮৩৬৩, সহীহ আত্ তারগীব ১৯২৮, সহীহ আল জামি‘ ৭৭৪১। ]
হাদিসের ব্যাখ্যা: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী : (لَا يَفْرَكْ) শেষ অক্ষর সাকীন বা জযম কিংবা পেশ উভয় যোগ পাঠ সিদ্ধ। (ر) বর্ণটি যবর যোগে পঠিত হয়; আভিধানিক অর্থ মর্দন করা, দলিত করা। মুল্লা ‘আলী কারী (রহঃ) বলেনঃ (فَرْكٌ) শব্দটি بُعْضٌ এর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, যার অর্থ ঘৃণা, অবজ্ঞা, অপছন্দ ইত্যাদি। হাদীসের অর্থ দাঁড়ায়, কোনো মু’মিন পুরুষ কোনো মু’মিনাহ্ নারীকে অর্থাৎ স্বামী তার স্ত্রীকে ঘৃণা করবে না। কোনো বিষয়েই ঘৃণা বা অবজ্ঞা করবে না, কারণ তার মধ্যে অন্য যে গুণটি রয়েছে তাতে সে খুশি হবে। একজন মানুষ হিসেবে সকল গুণ তার মধ্যে থাকতে পারে না।
কাযী ‘ইয়ায বলেনঃ (لَا يَفْرَكْ) এটা নাফী বা না-বাচক কর্ম কিন্তু অর্থ প্রদান করেছে নাহী বা নিষেধাজ্ঞাবাচক কর্মের। এর অর্থ হয়েছে স্ত্রীর অপছন্দনীয় কিছু দেখে তাকে অবজ্ঞা অথবা ঘৃণা করা কোনো পুরুষের জন্য উচিত নয়। কেননা একটি বিষয় সে অপছন্দ করছে অন্যটি সে অবশ্যই পছন্দ করবে এবং তাতে খুশি হবে। এই ভালো গুণটি দিয়ে সে খারাপটির মোকাবেলা করবে। এতে ইঙ্গিত রয়েছে যে, দোষ ছাড়া কোনো মানুষই পাওয়া যায় না, কেউ যদি দোষ ছাড়া কোনো মানুষ খুঁজতে যায় তাহলে সে সাথিহীন একাই পড়ে থাকবে।
এতে আরো ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, সকল মানুষই বিশেষ করে মু’মিনের মধ্যে কতিপয় উত্তম ও প্রশংসিত স্বভাব বা গুণাবলী রয়েছে, এই উত্তম আচরণ ও গুণাবলীকে বিবেচনায় আনবে আর অন্য খারাপ স্বভাবগুলো ঢেকে রাখবে এবং এড়িয়ে চলবে। (শারহে মুসলিম ৯/১০ খন্ড, হাঃ ১৪৬৯; মুসনাদ আহমাদ ২য় খন্ড, ৩২৯ পৃঃ; মিরকাতুল মাফাতীহ)