হাদিস বোখারী

                    -প্রথম অধ্যায়-
                     বিষয়:- ওহী
                       হাদিস:-০৭

‘আবদুল্লাহ ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেছেন

আবূ সুফিয়ান ইব্‌নু হরব তাকে বলেছেন,

রাজা হিরাক্লিয়াস একদা তাঁর নিকট লোক প্রেরণ করলেন।
তিনি তখন ব্যবসা উপলক্ষে কুরাইশদের কাফেলায় সিরিয়ায় ছিলেন।
আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সে সময় আবূ সুফিয়ান ও কুরাইশদের সঙ্গে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সন্ধিতে আবদ্ধ ছিলেন।
আবূ সুফিয়ান তার সাথী সহ হিরাক্লিয়াসের নিকট আসলেন এবং দোভাষীকে ডাকলেন।
অতঃপর জিজ্ঞেস করলেন,

‘এই যে ব্যক্তি নিজেকে নবী বলে দাবী করে-তোমাদের মাঝে বংশের দিক হতে তাঁর সবচেয়ে নিকটাত্মীয় কে’?

আবূ সুফিয়ান বলেন,

‘আমি বললাম,

বংশের দিক দিয়ে আমিই তাঁর নিকটাত্মীয়’।

তিনি বললেন,

‘তাঁকে আমার অতি নিকটে আন এবং তাঁর সাথীদেরকেও তার পেছনে বসিয়ে দাও’।
অতঃপর তাঁর দোভাষীকে বললেন,

'তাদের বলে দাও,

আমি এর নিকট সে ব্যক্তি সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞেস করব,
যদি সে আমার নিকট মিথ্যা বলে,
তখন সঙ্গে সঙ্গে তোমরা তাকে মিথ্যুক বলবে।

আবূ সুফিয়ান বলেন,

‘আল্লাহর কসম! আমার যদি এ লজ্জা না থাকত যে,
তারা আমাকে মিথ্যাবাদী বলে প্রচার করবে,
তবে আমি অবশ্যই তাঁর সম্পর্কে মিথ্যা বলতাম’।

অতঃপর তিনি তাঁর সম্পর্কে আমাকে সর্বপ্রথম যে প্রশ্ন করেন তা হলো,

‘বংশমর্যাদার দিক দিয়ে তোমাদের মধ্যে সে কিরূপ?

আমি বললাম,

‘তিনি আমাদের মধ্যে খুব সম্ভ্রান্ত বংশের’।

তিনি বললেন,

‘তোমাদের মধ্যে এর পূর্বে আর কখনো কি কেউ এরূপ কথা বলেছে?’

আমি বললাম,

‘না’।

তিনি বললেন,

‘তাঁর পূর্বপুরুষের মধ্যে কেউ কি বাদশাহ ছিলেন?

'আমি বললাম,

‘না’।

তিনি বললেন,

‘সম্ভ্রান্ত মর্যাদাবান শ্রেণীর লোকেরা তাঁর অনুসরণ করে, নাকি দুর্বল লোকেরা?’

আমি বললাম,

‘দুর্বল লোকেরা’।

তিনি বললেন,

‘তাদের সংখ্যা কি বাড়ছে, না কমছে?’

আমি বললাম,

‘তারা বেড়েই চলছে’।

তিনি বললেন,

‘তাঁর ধর্মে ঢুকে কেউ কি অসন্তুষ্ট হয়ে তা ত্যাগ করে?

’ আমি বললাম,

‘না’।

তিনি বললেন,

‘তাঁর দাবীর পূর্বে তোমরা কি কখনো তাঁকে মিথ্যার অভিযোগে অভিযুক্ত করেছ?’

আমি বললাম,

‘না’।

তিনি বললেন,

‘তিনি কি সন্ধি ভঙ্গ করেন?

’ আমি বললাম,

‘না’।

তবে আমরা তাঁর সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট সময়ের সন্ধিতে আবদ্ধ আছি।
জানি না এর মধ্যে তিনি কি করবেন’।

আবূ সুফিয়ান বলেন,

‘এ কথাটি ব্যতীত নিজের পক্ষ হতে আর কোন কথা যোগ করার সু্যোগই আমি পাইনি’।

তিনি বললেন,

‘তোমরা তাঁর সঙ্গে কখনো যুদ্ধ করেছ কি?’

আমি বললাম,

‘হ্যাঁ’।

তিনি বললেন,

‘তাঁর সঙ্গে তোমাদের যুদ্ধের পরিণাম কি হয়েছে?’

আমি বললাম,

‘তাঁর ও আমাদের মধ্যে যুদ্ধের ফলাফল কুপের বালতির ন্যায়’।
কখনো তাঁর পক্ষে যায়,
আবার কখনো আমাদের পক্ষে আসে’।

তিনি বললেন,

‘তিনি তোমাদের কিসের আদেশ দেন?’

আমি বললাম,

‘তিনি বলেনঃ

তোমরা এক আল্লাহর ইবাদত কর এবং তাঁর সঙ্গে কোন কিছুর অংশীদার সাব্যস্ত করো না এবং তোমাদের পূর্বপুরুষরা যা বলে তা ত্যাগ কর।
আর তিনি আমাদের সালাত আদায়ের, সত্য বলার,
চারিত্রিক নিষ্কলুষতার এবং আত্মীয়দের সঙ্গে সদাচরণ করার নির্দেশ দেন’।

অতঃপর তিনি দোভাষীকে বললেন,

‘তুমি তাকে বল,
আমি তোমার নিকট তাঁর বংশ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছি।
তুমি তার জবাবে উল্লেখ করেছ যে,
তিনি তোমাদের মধ্যে সম্ভ্রান্ত বংশের।
প্রকৃতপক্ষে রসূলগণকে তাঁদের কওমের উচ্চ বংশেই পাঠানো হয়ে থাকে।
তোমাকে জিজ্ঞেস করেছি,
এ কথা তোমাদের মধ্যে ইতিপূর্বে আর কেউ বলেছে কিনা?

তুমি বলেছ, ‘না’।
তাই আমি বলছি,
পূর্বে যদি কেউ এরূপ বলত,
তবে আমি অবশ্যই বলতাম,
ইনি এমন এক ব্যক্তি,
যিনি তাঁর পুর্বসূরীর কথারই অনুসরণ করছেন।
আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করেছি,
তাঁর পূর্বপুরুষদের মধ্যে কোন বাদশাহ ছিলেন কিনা?
তুমি তার জবাবে বলেছ, ‘না’।
তাই আমি বলছি যে,
তাঁর পূর্বপুরুষের মধ্যে যদি কোন বাদশাহ থাকতেন,
তবে আমি বলতাম,
ইনি এমন এক ব্যক্তি যিনি তাঁর বাপ-দাদার বাদশাহী ফিরে পেতে চান।
আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করেছি-এর পূর্বে কখনো তোমরা তাঁকে মিথ্যার অভিযোগে অভিযুক্ত করেছ কিনা?
তুমি বলেছ, ‘না’।
এতে আমি বুঝলাম,
এমনটি হতে পারে না যে,
কেউ মানুষের ব্যাপারে মিথ্যা পরিত্যাগ করবে আর আল্লাহর ব্যাপারে মিথ্যা বলবে।
আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করেছি,
সম্ভ্রান্ত লোক তাঁর অনুসরণ করে, না সাধারণ লোক?
তুমি বলেছ,
সাধারণ লোকই তাঁর অনুসরণ করে।
আর বাস্তবেও এই শ্রেনীর লোকেরাই হন রসূলগণের অনুসারী।
আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করেছি,
তারা সংখ্যায় বাড়ছে না কমছে?
তুমি বলেছ, বাড়ছে।
প্রকৃতপক্ষে ঈমানে পূর্ণতা লাভ করা পর্যন্ত এ রকমই হয়ে থাকে।
আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করেছি,
তাঁর দীনে প্রবেশ করে কেউ কি অসন্তুষ্ট হয়ে তা ত্যাগ করে?
তুমি বলেছ, ‘না’।
ঈমানের স্নিগ্ধতা অন্তরের সঙ্গে মিশে গেলে ঈমান এরূপই হয়।
আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করেছি,
তিনি সন্ধি ভঙ্গ করেন কিনা?
তুমি বলেছ, ‘না’।
প্রকৃতপক্ষে রসূলগণ এরূপই, সন্ধি ভঙ্গ করেন না।
আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করেছি,
তিনি তোমাদের কিসের আদেশ দেন?
তুমি বলেছ,
তিনি তোমাদের এক আল্লাহর বন্দেগী করা ও তাঁর সঙ্গে অন্য কিছুর অংশীদার স্থাপন না করার নির্দেশ দেন।
তিনি তোমাদের নিষেধ করেন মূর্তিপূজা করতে আর তোমাদের আদেশ করেন সালাত আদায় করতে,
সত্য বলতে ও সচ্চরিত্র থাকতে।
তুমি যা বলেছ তা যদি সত্যি হয়,
তবে শীঘ্রই তিনি আমার দু’পায়ের নীচের জায়গার অধিকারী হবেন।
আমি নিশ্চিত জানতাম, তাঁর আবির্ভাব হবে;
কিন্তু তিনি যে তোমাদের মধ্য হতে হবেন, এ কথা ভাবতে পারিনি।
যদি জানতাম,
আমি তাঁর নিকট পৌছতে পারব,
তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য আমি যে কোন কষ্ট সহ্য করে নিতাম।
আর আমি যদি তাঁর নিকট থাকতাম তবে অবশ্যই তাঁর দু’খানা পা ধৌত করে দিতাম।
অতঃপর তিনি আল্লাহর রসূল
(সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-
এর সেই পত্রখানি আনার নির্দেশ দিলেন,
যা তিনি দিহ্‌ইয়াতুল কালবী (রাঃ)-কে দিয়ে বসরার শাসকের মাধ্যমে হিরাক্লিয়াসের নিকট প্রেরণ করেছিলেন।
তিনি তা পড়লেন।

তাতে (লেখা) ছিলঃ

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

(পরম করুণাময় দয়ালু আল্লাহর নামে)।

আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রসূল মুহাম্মাদ
(সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)
-এর পক্ষ হতে রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াসের প্রতি।
-শান্তি (বর্ষিত হোক) তার প্রতি,
যে হিদায়াতের অনুসরণ করে।
তারপর আমি আপনাকে ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছি।
ইসলাম গ্রহণ করুন, শান্তিতে থাকবেন।
আল্লাহ আপনাকে দ্বিগুণ প্রতিদান দান করবেন।
আর যদি মুখ ফিরিয়ে নেন,
তবে সকল প্রজার পাপই আপনার উপর বর্তাবে।
“হে আহলে কিতাব!
এসো সে কথায় যা আমাদের ও তোমাদের মধ্যে এক ও অভিন্ন।
তা হল, আমরা যেন আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদত না করি,
কোন কিছুকেই যেন তাঁর শরীক সাব্যস্ত না করি এবং আমাদের কেউ যেন কাউকে পালনকর্তারূপে গ্রহণ না করে আল্লাহকে ত্যাগ করে।
যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে তোমরা বল,

“তোমরা সাক্ষী থাক, আমারা তো মুসলিম”।

(সূরা আল-‘ইমরান ৩/৬৪)

আবূ সুফিয়ান বলেন,

‘হিরাক্লিয়াস যখন তাঁর বক্তব্য শেষ করলেন এবং পত্র পাঠও শেষ করলেন,
তখন সেখানে হট্টগোল শুরু হয়ে গেল,
চীৎকার ও হৈ-হল্লা চরমে পৌছল এবং আমাদেরকে বের করে দেয়া হলো।
আমাদেরকে বের করে দিলে

আমি আমার সাথীদের বললাম,

আবূ কাবশার [১] ছেলের বিষয় তো শক্তিশালী হয়ে উঠেছে,
বনূ আসফার (রোম)-এর বাদশাহও তাকে ভয় পাচ্ছে!
তখন থেকে আমি বিশ্বাস রাখতাম,
তিনি শীঘ্রই জয়ী হবেন।
অবশেষে আল্লাহ তা’আলা আমাকে ইসলাম গ্রহণের তাওফীক দান করলেন।
ইব্‌ন নাতূর ছিলেন জেরুযালেমের শাসনকর্তা এবং হিরাক্লিয়াসের বন্ধু ও সিরিয়ার খৃস্টানদের পাদ্রী।

তিনি বলেন,

হিরাক্লিয়াস যখন জেরুজালেম আসেন, তখন একদা তাঁকে অত্যন্ত মলিন দেখাচ্ছিল।
তাঁর একজন বিশিষ্ট সহচর বলল, ‘আমরা আপনার চেহারা আজ এত মলিন দেখছি, ইব্‌নু নাতূর বলেন, হিরাক্লিয়াস ছিলেন জ্যোতির্বিদ, জ্যোতির্বিদ্যায় তাঁর দক্ষতা ছিল।
তারা জিজ্ঞেস করলে তিনি তাদের বললেন,

‘আজ রাতে আমি তারকারাজির দিকে তাকিয়ে দেখতে পেলাম, খতনাকারীদের বাদশাহ আবির্ভূত হয়েছেন।
বর্তমান যুগে কোন্‌ জাতি খাতনা করে’?

তারা বলল,

‘ইয়াহূদ জাতি ব্যতীত কেউ খাতনা করে না।
কিন্তু তাদের ব্যাপারে আপনি মোটেও চিন্তিত হবেন না।
আপনার রাজ্যের শহরগুলোতে লিখে পাঠান, তারা যেন সেখানকার সকল ইয়াহূদীকে কতল করে ফেলে’।
তারা যখন এ ব্যাপারে ব্যতিব্যস্ত ছিল,
তখন হিরাক্লিয়াসের নিকট জনৈক ব্যক্তিকে হাযির করা হলো,
যাকে গাস্‌সানের শাসনকর্তা পাঠিয়েছিল।
সে আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সম্পর্কে খবর দিচ্ছিল।
হিরাক্লিয়াস তার কাছ থেকে খবর জেনে নিয়ে বললেন,
‘তোমরা একে নিয়ে গিয়ে দেখ, তার খাতনা হয়েছে কি-না’।
তারা তাকে নিয়ে গিয়ে দেখে এসে সংবাদ দিল, তার খতনা হয়েছে।
হিরাক্লিয়াস তাকে আরবদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে সে জওয়াব দিল, ‘তারা খাতনা করে’।

অতঃপর হিরাক্লিয়াস তাদের বললেন,

ইনি [আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)] এ উম্মতের বাদশাহ।
তিনি আবির্ভূত হয়েছেন’।
আতঃপর হিরাক্লিয়াস রোমে তাঁর বন্ধুর নিকট লিখলেন।
তিনি জ্ঞানে তাঁর সমকক্ষ ছিলেন।
পরে হিরাক্লিয়াস হিমস চলে গেলেন।
হিমসে থাকতেই তাঁর নিকট তাঁর বন্ধুর চিঠি এলো,
যা নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর আবির্ভাব এবং তিনিই যে প্রকৃত নবী,
এ ব্যাপারে হিরাক্লিয়াসের মতকে সমর্থন করছিল।
তারপর হিরাক্লিয়াস তাঁর হিমসের প্রাসাদে রোমের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের ডাকলেন এবং প্রাসাদের সকল দরজা বন্ধ করার আদেশ দিলে দরজা বন্ধ করা হলো।

অতঃপর তিনি সম্মুখে এসে বললেন,

হে রোমের অধিবাসী!
তোমরা কি মঙ্গল,
হিদায়াত এবং তোমাদের রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব চাও?
তাহলে এই নবীর বায়’আত গ্রহণ কর’।
এ কথা শুনে তারা বন্য গাধার ন্যায় দ্রুত নিঃশ্বাস ফেলতে ফেলতে দরজার দিকে ছুটল,
কিন্তু তারা তা বন্ধ দেখতে পেল।
হিরাক্লিয়াস যখন তাদের অনীহা লক্ষ্য করলেন এবং তাদের ঈমান থেকে নিরাশ হয়ে গেলেন,

তখন বললেন,

‘ওদের আমার নিকট ফিরিয়ে আন’।

তিনি বললেন,

‘আমি একটু পূর্বে যে কথা বলেছি,
তা দিয়ে তোমরা তোমাদের দীনের উপর কতটুকু অটল,
কেবল তার পরীক্ষা করছিলাম।
এখন তা দেখে নিলাম’।
একথা শুনে তারা তাঁকে সাজদাহ করল এবং তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হলো।
এটাই ছিল হিরাক্লিয়াসের সর্বশেষ অবস্থা।

আবূ ‘আবদুল্লাহ [বুখারী (রহঃ)] বলেন,

সালিহ ইব্‌নু কায়সান (রহঃ) , ইউনুস (রহঃ) ও মা’মার (রহঃ) এ হাদীস যুহরী (রহঃ) থেকে রিওয়ায়াত করেছেন।

সহিহ বুখারী, হাদিস নং ৭

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন

যোগাযোগ ফর্ম